বরগুনায় পাঁচ বছর ধরে স্থবির অবস্থায় পড়ে আছে নির্মাণাধীন ২৬টি সেতুর কাজ। এতে একদিকে ভোগান্তিতে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা অপরদিকে পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে এসব সেতুর নির্মাণ সামগ্রী।
স্থবির ২৬ সেতুর নির্মাণ কাজ
প্রায় ৮৫ কোটি টাকা ব্যয়ে এসব সেতুর নির্মাণ কাজ শুরু করে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের দাবি, নানা জটিলতায় নির্ধারিত সময়ে শেষ হয়নি এসব সেতুর নির্মাণ কাজ। অথচ এলজিইডি বলছেন, দ্রুত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা হবে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৯ সাল থেকে বরগুনার বিভিন্ন উপজেলায় এলজিইডির আওতায় নির্মাণ শুরু হওয়া ২৬টি সেতুর কাজ স্থবির হয়ে আছে। যার মধ্যে রয়েছে বরগুনা সদর উপজেলায় ১১টি, আমতলীতে সাতটি, বেতাগীতে পাঁচটি এবং তালতলী, পাথরঘাটা ও বামনা উপজেলায় একটি করে।
এসব সেতুর কাজ শুরুর পর থেকে এক বছরের মধ্যে হস্তান্তরের নিয়ম থাকলেও পাঁচ বছরেও তা হস্তান্তর হয়নি। কবে নাগাদ এসব কাজ শেষ হবে তারও কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। ফলে স্থানীয়দের চলাচলে সৃষ্টি হয়েছে চরম দুর্ভোগ।

নির্মাণাধীন ২৬টি সেতুর ব্যয় ধরা হয়েছে ৮৪ কোটি ৮৯ লাখ ৭৮ হাজার ৭৭০ টাকা। সরেজমিন বরগুনা ও আমতলীতে দেখা যায়, আমতলী-তালতলী সড়কের আড়পাঙ্গাশিয়া বাজারসংলগ্ন খালে পৌনে পাঁচ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন ৬০ মিটার গার্ডার সেতুর কাজ ২০২০ সালের ১২ এপ্রিল শুরু হয়ে ২০২১ সালের ১২ এপ্রিল শেষ হওয়ার কথা থাকলেও হয়েছে মাত্র ৬০ ভাগ কাজ। অথচ এ সড়কটি জেলা শহরসহ আমতলী-তালতলী দুই উপজেলার একমাত্র সংযোগ সড়ক।
তাছাড়া প্রতিদিন এ সড়ক দিয়ে রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলার যাত্রীবাহী পরিবহণসহ অসংখ্য ভারী যানবাহন চলাচল করে থাকে। এছাড়া আমতলীর আঠারোগাছিয়া ইউনিয়নের তাফালবাড়ী খালে তিন কোটি ৩৭ লাখ টাকা ব্যয়ে ৩৭ মিটার গার্ডার সেতুর কাজ শুরু হয়েছে ২০১৯ সালের ২৩ জুলাই, যা শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২০ সালের ৩১ অক্টোবর। কিন্তু কাজ শেষের মেয়াদের চার বছর অতিবাহিত হলেও এখন পর্যন্ত শেষ হয়েছে ৬৫ ভাগ কাজ।
আবার একই এলাকার সোনাখালীতে ছয় কোটি টাকা ব্যয়ে ৭২ মিটার সেতুর কাজ শুরু হয় ২০২০ সালের ১৩ জানুয়ারি, যা হস্তান্তর করার কথা ছিল ২০২১ সালের ১৩ জানুয়ারির মধ্যে। এরপর কাজের মেয়াদ বাড়ানো হলেও তা শেষ হওয়ার কথা ছিল গত বছরের ১৩ নভেম্বর। কিন্তু কাজ তো শেষ হয়ইনি উলটো বন্ধ রয়েছে কাজ। সংশ্লিষ্ট এলজিইডি কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী এ পর্যন্ত সেতুর কাজ সমাপ্ত হয়েছে ৭০ ভাগ।

এদিকে বরগুনা জেলা বাস ও মিনিবাস মালিক সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. ছগির হোসেন একাই করছেন আটটি সেতুর কাজ, যার মধ্যে ছয়টির কাজ হয়েছে ৯০ ভাগ এবং তিনটির শেষ হয়েছে ৬০-৬৫ ভাগ কাজ। বরগুনা সদর উপজেলার সুজার খেয়াঘাটে ৪০০ মিটার সেতু নির্মাণ শুরু হয় ২০২১ সালের এপ্রিলে। প্রায় পাঁচ কোটি ৫৯ লাখ টাকা ব্যয়ে কাজ শুরু হয়ে ২০২২ সালে নির্মাণ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও গত জুনে মেয়াদ বাড়িয়ে কাজ শেষ হয়েছে মাত্র ৬৫ ভাগ। সেতুটি শহরের একদম নিকটবর্তী হওয়ার পরও এখানে কাজ চলছে ঠিকাদারের ইচ্ছামতো।
বাঁশ-কাঠ দিয়ে করা হয়েছে সেতুর ঢালাইয়ের চালা। আবার যে স্প্যান ঢালাই হয়েছে তা-ও অবহেলার কারণে বেঁকে গেছে ভিম, আবার অনেক জায়গায় আঁকাবাঁকা করে বাঁধা হয়েছে রড। ঠিকাদার ছগিরের আরেকটি সেতু নির্মাণ চলছে কেওড়াবুনিয়া খালে। তিন কোটি ৯০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ কাজ ২০২১ সালে শুরু হয়ে ২০২২ এ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও ৯০ ভাগ কাজ করে ফেলে রাখা হয়েছে। আমতলীর আড়পাঙ্গাশিয়া এলাকার গাড়িচালক আ. হাকিম বলেন, ‘এ রাস্তা দিয়ে আমরা প্রতিনিয়ত ইটসহ অন্যান্য মালামাল পরিবহণের জন্য আমতলী শহরে যাই।
কিন্তু ব্রিজটি না হওয়ায় পাশের একটি পুরোনো ঝুঁকিপূর্ণ ব্রিজ পাড় হয়ে যেতে হয়। এতে যে কোনো সময় পুরোনো ব্রিজটি ভেঙে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের মধ্যে বরগুনায় আটটি কাজ পাওয়া ঠিকাদার মো. ছগির হোসেন বলেন, ‘৯০ ভাগ কাজ হওয়া ছয়টি সেতুর কাজ শেষ। এখন শুধু সংযোগ সড়ক বাকি আছে। এগুলোর সংশোধিত প্রাক্কলনের জন্য এলজিইডি কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করা হয়েছে।

আর সেগুলো অনুমোদন হলে দ্রুত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা হবে। আর বাকি সেতুর ঢালাইয়ের প্রস্তুতি চলছে।’ কাজের মানের সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ঢালাইয়ের সময় তিনটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকেন, সেক্ষেত্রে অনিয়মের সুযোগ নেই। বরগুনা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মেহেদী হাসান বলেন, ‘বরগুনায় ২৬টি সেতুর কাজ পাওয়া প্রত্যেক ঠিকাদারের সঙ্গে আমি কথা বলেছি এবং সব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ২৮ দিনের মধ্যে কাজ শুরুর তাগাদা দিয়ে চূড়ান্ত নোটিশ করা হয়েছে। অন্যথায় চুক্তি বাতিলসহ পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’