বরগুনা জেলার ব্যবসা ও অর্থনীতি

বরগুনা জেলা বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় বরিশাল বিভাগের একটি উপকূলীয় জেলা, যা তার প্রাকৃতিক সম্পদ, নদী-নালা এবং সমুদ্র সৈকতের জন্য পরিচিত। জেলার আয়তন প্রায় ১,৮৩১ বর্গকিলোমিটার, এবং ২০২২ সালের আদমশুমারি অনুসারে জনসংখ্যা ১০,১০,৫৩১ জন, যার ঘনত্ব ৫৫২ জন প্রতি বর্গকিলোমিটার। শহুরে জনসংখ্যা মাত্র ২২.৮৫%, এবং সাক্ষরতার হার (৭ বছরের উর্ধ্বে) ৮০.৬৫%। জেলার অর্থনীতি মূলত কৃষি, মৎস্য এবং ছোট-খাটো শিল্প-বাণিজ্যের উপর নির্ভরশীল। বড় ধরণের শিল্প-কারখানা বা বাণিজ্য কেন্দ্রের অভাব থাকলেও, স্থানীয় সম্পদের উপর ভিত্তি করে বিভিন্ন কুটির ও ছোট শিল্প গড়ে উঠেছে। এই আর্টিকেলে আমরা জেলার ব্যবসা-বাণিজ্যের বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরবো, যা মূল আর্টিকেলের তথ্যের সাথে অতিরিক্ত রিলেভেন্ট তথ্য যোগ করে সমৃদ্ধ করা হয়েছে।

বরগুনা জেলার ব্যবসা

 

বরগুনা জেলার ব্যবসা

অর্থনীতির সাধারণ চিত্র

বরগুনার অর্থনীতি কৃষি-নির্ভর, যা জেলার মোট আয়ের ৬২.৬৭% অবদান রাখে। এরপর বাণিজ্য (১৩.৩৮%), অ-কৃষি শ্রম (৪.৪৮%), পরিবহন (২.০৩%) এবং শিল্প (মাত্র ০.৭%)। উপকূলীয় অবস্থানের কারণে মৎস্য খাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা স্থানীয় কর্মসংস্থানের একটি বড় অংশ নিশ্চিত করে। COVID-১৯ মহামারী এ খাতকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছে, বিশেষ করে ছোট-খাটো মৎস্য ব্যবসায়ীদের। জেলায় বাংলাদেশ স্মল অ্যান্ড কটেজ ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশন (BSCIC) এর একটি শিল্প এলাকা রয়েছে, যা ছোট শিল্পগুলোকে সহায়তা করে এবং জমির মূল্য কমিয়ে নতুন বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করছে। এছাড়া, SME ক্লাস্টারগুলো (যেমন হ্যান্ডিক্রাফট এবং অ্যাগ্রো-প্রসেসিং) জেলার অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

 

বরগুনা জেলার ব্যবসা

 

শিল্প ও ব্যবসায়িক কার্যকলাপ

মূল আর্টিকেলে উল্লেখিত শিল্পগুলোর সাথে মিলিয়ে, বরগুনায় বড় ধরণের শিল্পের অভাব রয়েছে, কিন্তু ছোট-খাটো ও কুটির শিল্পগুলো স্থানীয় অর্থনীতিকে চালিত করে। নিম্নে বিস্তারিত তালিকা:

  • খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প: বরগুনা সদর উপজেলায় ২০৪ টি (মূল আর্টিকেল অনুসারে), যা চালকল, আটা কল, আইস ফ্যাক্টরি ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত। সামগ্রিকভাবে জেলায় ২৫টি খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, SACO Enterprise নামক একটি কোম্পানি জেলায় পালস (ডাল) প্রসেসিং মিল চালায়, যা বাংলাদেশের একমাত্র এ ধরনের মিল।
  • ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প (গাড়ির বডি তৈরি ও মেরামত): সদর উপজেলায় ১৫ টি। এছাড়া, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং ক্লাস্টারগুলো SME-এর অংশ।
  • নদী উপকূলবর্তী শিল্প (লঞ্চ, ট্রলারের বডি তৈরি ও মেরামত): ৩ টি। এটি উপকূলীয় অবস্থানের সুবিধা নিয়ে গড়ে উঠেছে, যেখানে কাঠমিস্ত্রিরা নৌকা ও অন্যান্য উপকূলীয় দ্রব্য তৈরি করে।
  • বন ও বনজ শিল্প: সদরে ১৭ টি, যা করাতকল, বাঁশ-বেতের কাজ এবং কাঠের কাজ অন্তর্ভুক্ত। ঐতিহাসিকভাবে সুন্দরবনের কাছে অবস্থিত হওয়ায় কাঠ ব্যবসা প্রধান ছিল।
  • রসায়ন শিল্প: ৪১ টি (দাঁতের মাজন, আগরবাতি, সিরাপ, মোমবাতি, কেশ তৈল, বলপেন, জর্দা, গোলাপজল, ব্যাটারি এবং বাটার অয়েল তৈরি)। সামগ্রিকভাবে জেলায় ১০টি রাসায়নিক শিল্প রয়েছে, যা সাবান কারখানা ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত।
  • বস্ত্রজাত কুটির শিল্প (পোশাক তৈরি): ২৬ টি। তালতলী উপজেলা তাঁত শিল্পের জন্য বিখ্যাত, যা স্থানীয় বস্ত্র উৎপাদনে অবদান রাখে। জেলায় ১০টি বস্ত্র-সংশ্লিষ্ট কুটির শিল্প রয়েছে।
  • কয়ার শিল্প (পাপোষ এবং বাঁশজাত দ্রব্য): ২০ টি। এছাড়া, হ্যান্ডিক্রাফট ক্লাস্টারগুলো (৩৮টি দেশব্যাপী, যার মধ্যে বরগুনায় অংশ) বাঁশ-বেতের কাজকে প্রসারিত করে।

অন্যান্য শিল্পের মধ্যে সোনার কাজ, লোহার কাজ, কুমোর, দর্জি এবং কলম কারখানা উল্লেখযোগ্য। জেলায় মোট ৩৫টি বিবিধ শিল্প রয়েছে।

কৃষি খাত

কৃষি জেলার প্রধান অর্থনৈতিক স্তম্ভ। মোট কৃষি জমি ১০৪,২৩১ হেক্টর। প্রধান শস্য: ধান, ডাল, তরমুজ, চিনাবাদাম, সরিষা, সূর্যমুখী, পান, কলা, সুপারি এবং গুড়। পাট চাষ একসময় জনপ্রিয় ছিল কিন্তু এখন কমেছে। অ্যাগ্রো-প্রসেসিং ক্লাস্টার (দেশব্যাপী ৩৪টি) এ খাতকে সমর্থন করে।

মৎস্য খাত

উপকূলীয় জেলা হওয়ায় মৎস্য অর্থনীতির একটি বড় অংশ। পাথরঘাটা উপজেলা বাংলাদেশের ২য় বৃহত্তম মৎস্য কেন্দ্র। জেলা ইলিশ মাছের জন্য বিখ্যাত, যাকে “ইলিশের জেলা” বলা হয়, এবং এটি দেশ-বিদেশে রপ্তানি হয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৩,০৩৮ টন শুকনো মাছ রপ্তানি হয়েছে। চিংড়ি এবং অন্যান্য সামুদ্রিক মাছও উল্লেখযোগ্য। তবে শুকনো মাছ শ্রমিকরা নিম্ন মজুরি এবং খারাপ আবাসনের সমস্যায় ভুগছেন।

অন্যান্য খাত: পর্যটন ও সাম্প্রতিক উন্নয়ন

পর্যটন একটি উদীয়মান খাত, যা সমুদ্র সৈকত (যেমন কুয়াকাটা সৈকতের কাছে), বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য এবং ঐতিহাসিক স্থানের উপর নির্ভর করে। পদ্মা সেতু এ খাতকে আরও প্রসারিত করবে। সাম্প্রতিক উন্নয়নে BSCIC-এর শিল্প এলাকা এবং অ্যাগ্রো-প্রসেসিং মিলগুলো নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করছে।

সারাংশে, বরগুনার ব্যবসা-বাণিজ্য স্থানীয় সম্পদের উপর নির্ভরশীল, কিন্তু যোগাযোগ উন্নয়নের মাধ্যমে ভবিষ্যতে আরও সম্ভাবনা রয়েছে। এই তথ্যগুলো মূল আর্টিকেলকে সমৃদ্ধ করেছে, যা সাম্প্রতিক ডেটা এবং বিস্তারিত বিশ্লেষণ যোগ করে।

১ thought on “বরগুনা জেলার ব্যবসা ও অর্থনীতি”

Leave a Comment