আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় বরগুনা জেলার ইতিহাস, বরগুনা-জেলা বাংলাদেশের ৮টি বিভাগের মধ্যে বরিশাল বিভাগের অন্তর্গত ।

বরগুনা জেলার ইতিহাস:-
বরগুনা জেলার নামকরণের ইতিহাস একটি জটিল ও বহুমুখী। একটি তত্ত্ব হল বরগুনা নামটি এসেছে বাংলা শব্দ “বড়গুন” থেকে যার অর্থ “উচ্চ জোয়ার”। এই তত্ত্বটি এই সত্য দ্বারা সমর্থিত যে জেলাটি খাকদন নদীর তীরে অবস্থিত, যা জোয়ার-ভাটার জন্য পরিচিত। অতীতে, উত্তরাঞ্চলের কাঠ ব্যবসায়ীদের নদীতে তাদের নৌকা টেনে তোলার জন্য প্রায়ই জোয়ারের জন্য অপেক্ষা করতে হতো। ধারণা করা হয়, এই অপেক্ষার কারণেই বরগুনা নামের উৎপত্তি হয়েছে।
আরেকটি তত্ত্ব হল এই এলাকায় বসতি স্থাপনকারী বিশিষ্ট মগ সম্প্রদায়ের নাম থেকে বরগুনা নামটি এসেছে। মগরা হল মধ্য এশিয়ায় উদ্ভূত একদল লোক, এবং তাদের বাংলাদেশে বসবাসের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। এটা বিশ্বাস করা হয় যে মগরা ছিল সর্বপ্রথম এই অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে যেটি বর্তমানে বরগুনা জেলা, এবং তাদের নামই এই জেলার নামের উত্থান ঘটায়।
অবশেষে এটাও সম্ভব যে বরগুনা নামটি কেবল এলাকার আসল নামের অপভ্রংশ। এলাকাটি মূলত “বরগা” নামে পরিচিত ছিল এবং এটা সম্ভব যে সময়ের সাথে সাথে অন্যান্য ভাষা বা সংস্কৃতির প্রভাবের কারণে নামটি পরিবর্তন করে বরগুনা রাখা হয়েছিল।
নামের প্রকৃত উৎপত্তি যাই হোক না কেন, বরগুনা একটি সমৃদ্ধ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সমৃদ্ধ একটি সুন্দর ও ঐতিহাসিক জেলা। জেলাটি একটি বৈচিত্র্যময় জনসংখ্যার আবাসস্থল এবং এটি পর্যটকদের জন্য একটি জনপ্রিয় গন্তব্যস্থল।

বৃটিশ আমলে প্রশাসনিক সুবিধার জন্য ১৮৭১ সনে পটুয়াখালী মহকুমা সৃষ্টি হয়। তখন এ মহকুমায় পটুয়াখালী,মির্জাগঞ্জ,গুলিশাখালী ,বাউফল ও গলাচিপাসহ মোট ৫টি থানা ছিল। বামনা ও পাথরঘাটা ছিল মঠবাড়ীয়া থানাধীন।এ সময় বরগুনা গুলিসাখালী থানাধীন ছিল।পরবর্তীতে উক্ত শতাব্দীর শেষ দিকে প্রশাসনিক সুবিধার জন্য বামনা ,পাথরঘাটা,বরগুনা বেতাগী ও খেপুপাড়া থানার সৃষ্টি হয়। থানা হিসাবে নামকরণের মাধ্যমে বাংলাদেশের মানচিত্রে বরগুনার নাম স্থান পায়।
চতুর্দশ শতাব্দীতে সমগ্র দক্ষিণাঞ্চল ছিল বাকেরগঞ্জের অধীন । আঠারো শতকের মধ্যভাগে পূর্ব বাংলার আলোচিত ব্যক্তি ছিলেন আগাবাকের খান। তাঁর জমিদারি ছিল বাকলা চন্দ্রদ্বীপে। পটুয়াখালী ও বরিশালকে বলা হতো বাকলা চন্দ্রদ্বীপ। শাসনকার্য পরিচালনার জন্য বৃটিশ সরকার ১৭৯৭ সনে ৭ নং রেজুলেশন অনুসারে আগাবাকের খানের নামনুসারে বাকেরগঞ্জ জেলার সৃষ্টি করেন। শান্তি শৃংখলা রক্ষার জন্য এবং জলদস্যুদের আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য উনিশ শতকের প্রথম দিকে বিশখালী নদীর তীরে ফুলঝুড়িতে একটা অস্থায়ী পুলিশ ফাঁড়ি নির্মাণ করা হয়। পরবর্তীতে ১৯০৪ সালে বরগুনাতে স্থায়ীভাবে ১ টি পুলিশ ষ্টেশন স্থাপন করা হয় ও গুলিশাখালী থানাকে আমতলী ও বরগুনা নামে দুটি পৃথক থানা করা হয় । পরবর্তীকালে বঙ্গোপসাগরে চর পড়তে থাকে এবং সুন্দরবন অঞ্চল আবাদ হয়ে বিরাট জনপদের সৃষ্টি হয় । এভাবে বরগুনা থানার পরিধিও বিস্তার লাভ করে ।

এক কালের সুন্দর বনাঞ্চলের বরগুনা ক্রমান্বয়ে ঘনবসতিপূর্ণ স্থানে পরিণত হয়। এ এলাকাতে রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক তৎপরতা শুরু হয়। শাসন কার্যের সুবিধা, আয়তন ও লোক সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় ১৯৬৯ সনে পটুয়াখালী জেলা সৃষ্টির সাথে মহকুমা শহর হিসাবে বরগুনা ইতিহাসের পাতায় স্থান পায়। কলাপাড়া, আমতলী,বরগুনা,বেতাগী এবং পিরোজপুর মহকুমার পাথরঘাটা এবং বামনা থানা নিয়ে বরগুনা মহকুমা গঠিত হয়। বরগুনা মহকুমা সদরের সাথে যোগাযোগের অসুবিধার কারণে পরবর্তীতে কলাপাড়া থানা পটুয়াখালী মহকুমার সাথে যুক্ত হয়।মহকুমায় রুপান্তরিত হওয়ার আগে থেকেই বরগুনা শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে অন্যান্য এলাকার সাথে তাল মিলিয়ে অগ্রসর হতে থাকে।পরবর্তীকালে সময়ের প্রয়োজনে ১৯৮৪ সালে ২৮ ফেব্রুয়ারী বরগুনা মহকুমাকে জেলায় উন্নীত করা হয়।
আরও পড়ুনঃ
১ thought on “বরগুনা জেলার ইতিহাস”