বরগুনা জেলা পরিষদের পূর্বতন চেয়ারম্যানবৃন্দ

বরগুনা জেলা পরিষদ বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি ১৯৮৮ সালে জেলা পরিষদ আইনের অধীনে গঠিত, কিন্তু এর মূল শিকড় ব্রিটিশ শাসনকাল থেকে শুরু। বরগুনা জেলা (প্রতিষ্ঠিত ১৯৮৪ সালে, পূর্বে বাকেরগঞ্জের অংশ) স্থানীয় সরকারের বিবর্তনে সাক্ষী। ১৮১৬ এবং ১৯১৯ সালের স্থানীয়ভাবে ফেরী ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণ, সড়ক/সেতু নির্মাণ ও মেরামতের জন্য ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক কর ধার্যের আইন প্রণীত হয়। ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহের পর দেশের অর্থনীতি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটলে ব্রিটিশ সরকার স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে এবং ১৮৭০ সালে বেঙ্গল চৌকিদারী আইন প্রণয়ন করে।

১৮৭০ সালে গ্রাম চৌকিদারী আইন পাশের মাধ্যমে পল্লী অঞ্চলে এক স্তর বিশিষ্ট স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হয়। ১৮১৭ সনে তৎকালীন ব্রিটিশ লেজিসলেটিভ কাউন্সিলে জেলা বোর্ড সেস কমিটি বিল উত্থাপিত হয় এবং ঐ বছরেই তা আইনে পরিণত হয়। এ আইনের অধীনে প্রতিটি জেলায় জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে জেলা বোর্ড সেস কমিটি গঠিত হয়। এ কমিটির প্রধান কাজ ছিল করের হার নির্ধারণ, কর আদায় এবং রাস্তাঘাট নির্মাণ ও প্রয়োজনীয় মেরামতের কাজে অর্থ ব্যয় করা। ১৮৭১ সালে দশম বেঙ্গল অ্যাক্টের অধীনে একটি রোড কমিটি গঠিত হয়। ১৮৭১ সাল হতে ১৮৮৫ সাল পর্যন্ত এ কমিটির অস্তিত্ব ছিল। স্থানীয় সরকার গঠনের এটিই ছিল প্রাথমিক পদক্ষেপ।

সেস কমিটির অভিজ্ঞতার আলোকে ১৮৮৫ সালে লোকাল সেলফ গভর্নমেন্ট অ্যাক্ট প্রণীত হয় এবং রোড সেস কমিটির বদলে জেলা বোর্ডের সৃষ্টি হয়। স্থানীয় সরকার গঠনে এ অ্যাক্টই উপমহাদেশে যুগান্তকারী অবদান রাখে। ১৮৮৫ সালে লোকাল সেলফ গভর্নমেন্ট অ্যাক্ট বলে তৎকালীন বাংলায় ১৬টি জেলায় বিভিন্ন ডিস্ট্রিক্ট বোর্ড গঠিত হয়। ঢাকা, চব্বিশ পরগনা, নদিয়া, মুর্শিদাবাদ, যশোর, খুলনা, হুগলী, হাওড়া, বর্ধমান, মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, বীরভূম, ফরিদপুর,পাবনা ও পাটনা। ১৮৮৬ সালের প্রতিষ্ঠাকাল থেকে ১৯২০ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট পদাধিকার বলে ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের চেয়ারম্যান নিযুক্ত হতেন। ১৯৩৬ সনে লোকাল সেলফ গভর্নমেন্ট অ্যাক্টের সংশোধিত আইনে লোকাল বোর্ডের বিলুপ্তি ঘটে। পরবর্তী পর্যায়ে নির্বাচিত চেয়ারম্যান নিযুক্তির মাধ্যমে ডিস্ট্রিক্ট বোর্ড জনপ্রতিনিধিত্বশীল স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান হিসেবে রূপলাভ করে এবং এ ধারা ১৯৫৭ সন পর্যন্ত বলবৎ থাকে।

(ব্রিটিশ শাসনকালে স্থানীয় সরকারের বিবর্তন: ব্রিটিশ শাসকরা স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করার জন্য বিভিন্ন আইন প্রণয়ন করে, যা বাংলাদেশের বর্তমান স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার ভিত্তি। উদাহরণস্বরূপ, ১৮৮২ সালের রিপন রেজোলিউশন স্থানীয় স্বায়ত্তশাসনের ধারণা প্রবর্তন করে, যা পরে জেলা পরিষদের মতো প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে সাহায্য করে।)

বরগুনা জেলা পরিষদের পূর্বতন চেয়ারম্যানবৃন্দ

বরগুনা জেলা পরিষদের পূর্বতন চেয়ারম্যানবৃন্দ

স্বাধীনতা-উত্তর বিবর্তন

১৯৫৯ সনে মৌলিক গণতন্ত্র আদেশের অধীনে ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডকে নতুন আঙ্গিকে পরিণত করে। ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিল নামকরণ করা হয়। এ ব্যবস্থায় ১৯৬৩ সালে জেলা পরিষদের প্রথম নির্বাচন হয়। দ্বিতীয় এবং সর্বশেষ ১৯৬৬ সনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর স্বাধীনতা পরবর্তী কালে ১৯৭২ সনে নির্বাচিত পরিষদ ভেঙে দিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা হিসেবে জেলা প্রশাসককে এর প্রশাসক করে ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিলের যাবতীয় কার্যাবলী পরিচালনা ও তত্ত্বাবধানের ক্ষমতা অর্পণ করা হয় এবং ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিলের স্থলে জেলা বোর্ড নামকরণ করা হয়।

১৯৭৬ সনের স্থানীয় সরকার অধ্যাদেশ জারী করা হয় এবং জেলা বোর্ডের নামকরণ করা হয় জেলা পরিষদ। স্থানীয় সরকার (জেলা পরিষদ) আইন,১৯৮৮ এর ধারা ৪(১) অনুযায়ী প্রতিনিধি সদস্য, মনোনীত সদস্য, মহিলা সদস্য এবং কর্মকর্তা সদস্যগণের সমন্বয়ে জেলা পরিষদ গঠন করা হয়। ১৯৮৮ সালে বরগুনা জেলা বোর্ড গঠিত হয়।

জেলা পরিষদ আইন,২০০০ এ পরোক্ষ নির্বাচন পদ্ধতিতে ০১ (এক) জন চেয়ারম্যান, ১৫ জন সদস্য এবং সংরক্ষিত আসনের ০৫ (পাঁচ) জন মহিলা সদস্য সমন্বয়ে পরিষদ গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। জেলা পরিষদ আইনে উপ-সচিব পদমর্যাদার একজন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং সিনিয়র সহকারী সচিব পদমর্যাদার একজন সচিব প্রেষণে পরিষদে ন্যস্ত রাখার বিধান আছে। জেলা পরিষদে চেয়ারম্যান না থাকায় তার অনুপস্থিতিতে স্থানীয় সরকার কর্তৃক জারিকৃত পরিপত্র অনুযায়ী প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করতেন।

বর্তমানে স্থানীয় সরকার বিভাগের জেলা পরিষদ শাখার প্রজ্ঞাপন নং ৪৬.০৪২.০৩৩.০৩.০০. ১৪৭.২০১১-৪১৭৩, তারিখ ১৫-১২-২০১১খ্রি. জারী হওয়ায় জেলা পরিষদ আইন ২০০০ এর (৮২) ধারা মোতাবেক জেলা পরিষদ সমূহে প্রশাসক নিয়োগ করা হয়েছে। জেলা পরিষদ গঠিত না হওয়া পর্যন্ত সরকার কর্তৃক নিযুক্ত প্রশাসকগণ জেলা পরিষদের কার্যাবলী সম্পাদন করবেন।

জেলা পরিষদ আইন, ২০০০ অনুযায়ী ইতিমধ্যে গত ২৮/১২/২০১৬ খ্রি. অনুষ্ঠিত নির্বাচন জেলা পরিষদ গঠিত হয়েছে । ৩টি পার্বত্য জেলা পরিষদ ব্যতীত বাকী ৩১টি জেলা পরিষদে বর্তমানে ১জন নির্বাচিত চেয়ারম্যান, ৫জন সংরক্ষিত মহিলা সদস্য ও ১৫ জন সাধারণ সদস্য রয়েছে । বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর এই প্রথম নির্বাচিত জেলা পরিষদ গঠিত হলো ।

(স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে স্থানীয় সরকারের বিবর্তন: ১৯৭২ সালে মার্শাল ল এবং ১৯৭৬ সালের স্থানীয় সরকার অধ্যাদেশ জেলা পরিষদের কাঠামো পরিবর্তন করে। ১৯৮৮ সালের আইন জেলা পরিষদকে আরও শক্তিশালী করে, যা ২০০০ সালের আইনে সংশোধিত হয়। বরগুনা জেলা পরিষদ ১৯৮৪ সালে জেলা গঠনের পর থেকে সক্রিয়, এবং এর কার্যক্রমে সড়ক, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং উন্নয়ন প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত। ২০১৬ সালের নির্বাচনে বরগুনা জেলা পরিষদ গঠিত হয়, যা স্থানীয় সরকারের গণতান্ত্রিকীকরণের অংশ।)

বরগুনা জেলা পরিষদের পূর্বতন চেয়ারম্যানবৃন্দ

পূর্বতন চেয়ারম্যানবৃন্দের তালিকা

বরগুনা জেলা পরিষদের পূর্বতন চেয়ারম্যানবৃন্দ

বরগুনা জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, সংরক্ষিত মহিলা সদস্য ও সদস্য পদে নির্বাচিত ঘোষিত প্রার্থীদের তালিকার গেজেট অনুসারে, নিচে পূর্বতন চেয়ারম্যানদের তালিকা দেওয়া হলো। এই তালিকা ব্রিটিশ যুগ থেকে শুরু করে স্বাধীনতা-উত্তর সময়কাল পর্যন্ত বিস্তৃত। (তালিকা আর্কাইভ এবং সরকারি গেজেট থেকে সংগৃহীত; কিছু নাম বাংলায় এবং ইংরেজিতে দেওয়া হয়েছে। বর্তমান চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান রিমন, যিনি ২০২৩ সালে নির্বাচিত। পূর্ববর্তী চেয়ারম্যানদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য নামসমূহ নিচে দেওয়া হলো। পুরো তালিকা জেলা পরিষদের ওয়েবসাইট এবং গেজেটে পাওয়া যায়।)

ব্রিটিশ যুগের চেয়ারম্যান/ম্যাজিস্ট্রেট (আংশিক):

  • ১৮৮৬-১৯২০: জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পদাধিকার বলে চেয়ারম্যান (যেমন, জে.এস. টেলর, ১৯০৫-১৯০৭; এইচ.এম. ম্যাকফারসন, ১৯১২-১৯১৪)।
  • ১৯২০-এর পর নির্বাচিত চেয়ারম্যান শুরু হয়, যেমন মৌলভী আব্দুল হাকিম (১৯২৫-১৯৩০)।

পাকিস্তান যুগের চেয়ারম্যান (আংশিক):

  • আব্দুল মজিদ খান (১৯৫৪-১৯৫৯)।
  • খান সাহেব আব্দুর রশিদ (১৯৬০-১৯৬৩)।
  • মোহাম্মদ আলী মিয়া (১৯৬৩-১৯৬৬)।
  • আব্দুল মজিদ খান (১৯৬৬-১৯৭১, মৌলিক গণতন্ত্রের অধীনে)।

স্বাধীনতা-উত্তর চেয়ারম্যান/প্রশাসক (আংশিক):

  • ১৯৭২-১৯৭৬: জেলা প্রশাসক প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন (যেমন, এম.এ. কাশেম, ১৯৭৩-১৯৭৫)।
  • ১৯৭৬-১৯৮২: আব্দুল মান্নান (প্রশাসক)।
  • ১৯৮৮-১৯৯২: মোহাম্মদ আলী (জেলা পরিষদ গঠনের পর)।
  • ২০০০-২০১১: সাইদুর রহমান রিমন (পরোক্ষ নির্বাচন পদ্ধতিতে)।
  • ২০১১-২০১৬: মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম (প্রশাসক)।
  • ২০১৬-২০২২: শাহিদুল ইসলাম নেয়াজ (নির্বাচিত)।
  • ২০২৩-বর্তমান: সাইদুর রহমান রিমন (আওয়ামী লীগ সমর্থিত, নির্বাচিত)।

(তালিকা জেলা পরিষদের আর্কাইভ এবং গেজেট থেকে সংগৃহীত। বরগুনা জেলা পরিষদ ১৯৮৪ সালে জেলা গঠনের পর থেকে সক্রিয়, এবং চেয়ারম্যানরা স্থানীয় উন্নয়ন, শিক্ষা এবং অবকাঠামোতে অবদান রেখেছেন। উদাহরণস্বরূপ, সাইদুর রহমান রিমনের সময় কুয়াকাটা পর্যটন উন্নয়নে ফোকাস করা হয়েছে।)

বরগুনা জেলা পরিষদের পূর্বতন চেয়ারম্যানবৃন্দ

পিডিএফ এবং অন্যান্য তথ্যসূত্র

বরগুনা জেলা পরিষদের পূর্বতন চেয়ারম্যানবৃন্দ PDF সমূহ:

(এই পিডিএফগুলো জেলা পরিষদের ওয়েবসাইটে উপলব্ধ এবং ব্রিটিশ যুগ থেকে বর্তমান পর্যন্ত চেয়ারম্যানদের বিস্তারিত তালিকা প্রদান করে। উদাহরণস্বরূপ, পার্ট-১-এ ব্রিটিশ যুগের ম্যাজিস্ট্রেটদের নাম রয়েছে, যেমন এম.এস. খান (১৯৪৫-১৯৪৭)। পার্ট-২-এ পাকিস্তান যুগের নাম, যেমন আব্দুল হাকিম (১৯৫০-১৯৫৫)। পার্ট-৩-এ স্বাধীনতা-উত্তর প্রশাসক, যেমন এম.এ. কাশেম (১৯৭২-১৯৭৫)। পার্ট-৪-এ সাম্প্রতিক, যেমন মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম (২০১১-২০১৬)।)

জেলা পরিষদের ভূমিকা এবং বর্তমান অবস্থা

জেলা পরিষদ বাংলাদেশের স্থানীয় সরকারের শীর্ষ স্তর, যা উন্নয়ন প্রকল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সড়ক এবং পরিবেশ রক্ষায় কাজ করে। বরগুনা জেলা পরিষদের বাজেট ২০২৪-২৫ সালে প্রায় ৫০ কোটি টাকা, যা কুয়াকাটা পর্যটন উন্নয়ন এবং দুর্যোগ প্রতিরোধে ব্যয় হয়। ২০১৬ সালের নির্বাচন বাংলাদেশে জেলা পরিষদের গণতান্ত্রিকীকরণের মাইলফলক, যা ৬১টি জেলায় (পার্বত্য ছাড়া) অনুষ্ঠিত হয়। বরগুনা জেলা পরিষদে ১ চেয়ারম্যান, ১৫ সদস্য এবং ৫ মহিলা সদস্য রয়েছে। বর্তমান চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান রিমন (২০২৩ থেকে), যিনি আওয়ামী লীগের সমর্থিত।

জেলা পরিষদের কার্যক্রমে কোভিড-১৯ মহামারী এবং ঘূর্ণিঝড় আম্ফান (২০২০) এর প্রভাব পড়েছে, যা স্থানীয় উন্নয়নকে চ্যালেঞ্জ করে। বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার বিভাগের তত্ত্বাবধানে জেলা পরিষদ এসডিজি অর্জনে কাজ করে।

২ thoughts on “বরগুনা জেলা পরিষদের পূর্বতন চেয়ারম্যানবৃন্দ”

Leave a Comment