বরগুনা জেলার নদ-নদী

বরগুনা জেলা বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের একটি উপকূলীয় জেলা, যার ভৌগোলিক অবস্থান ও প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য গড়ে উঠেছে মূলত নদ-নদী ও সাগরের প্রভাবে। বঙ্গোপসাগরের নিকটবর্তী হওয়ায় এ জেলার নদীগুলো জোয়ার-ভাটা প্রবাহিত এবং লবণাক্ততার প্রভাব লক্ষ করা যায়। নদী, খাল ও দোন (ছোট প্রাকৃতিক নালা) বরগুনার মানুষের জীবনযাপন, কৃষি, মৎস্য, নৌ-যোগাযোগ এবং অর্থনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

বরগুনার ভূখণ্ড মূলত পদ্মা–মেঘনা নদীব্যবস্থার অববাহিকা অঞ্চলের অংশ। আড়িয়াল খাঁ, মধুমতি, মেঘনা ও গঙ্গা-পদ্মা নদীব্যবস্থার শাখা-প্রশাখার প্রভাবে এখানে বিস্তৃত নদী নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। নদীবাহিত পলল জমে এ জেলার ভূমি গঠিত হয়েছে, ফলে মাটি উর্বর হলেও নদীভাঙন একটি বড় সমস্যা।

বরগুনা জেলার নদ-নদী
বরগুনা জেলার নদ-নদী

 

নদী নির্ভর প্রকৃতি ও জীবন

বরগুনা জেলার প্রকৃতি প্রধানত নদী ও সাগর নির্ভর। এখানকার মানুষের প্রধান জীবিকা কৃষি, মৎস্য আহরণ, চিংড়ি চাষ, নৌবাণিজ্য ও ছোট ব্যবসা—যার প্রায় সবই নদীর ওপর নির্ভরশীল।
বর্ষাকালে নদীগুলো পানিপূর্ণ ও প্রবল স্রোতযুক্ত হয়, আর শুষ্ক মৌসুমে অনেক খাল ও শাখা নদীর নাব্যতা কমে যায়।

জেলায় প্রায় ৩০০টির বেশি প্রাকৃতিক খাল ও দোন রয়েছে, যা বর্ষাকালে জলাধার হিসেবে কাজ করে এবং শুষ্ক মৌসুমে কৃষিকাজে সহায়তা করে। বরগুনা জেলায় নদী ও জলাশয়ের মোট আয়তন প্রায় ১৬০ বর্গকিলোমিটার, যা জেলার মোট আয়তনের প্রায় ২২ শতাংশ

 

বরগুনা জেলার নদ-নদী

 

বরগুনা জেলার প্রধান নদ-নদী

বরগুনা জেলার উল্লেখযোগ্য ও প্রধান নদীগুলোর মধ্যে রয়েছে—

  • পায়রা (বুড়িশ্বর) নদী
  • বিষখালী নদী
  • বলেশ্বর নদী
  • হরিণঘাটা নদী
  • আন্ধারমানিক নদী
  • টিয়াখালী নদী
  • গুলিশাখালী নদী
  • আমুয়া নদী
  • আইলা নদী

এছাড়াও রয়েছে বহু ছোট নদী, খাল ও দোন যেমন—খাকদোন, টিয়াখালী দোন, বগীরখাল, বেহুলা নদী, চাকামাইয়া দোন, নিদ্রাখাল, আমতলী নদী ইত্যাদি।

উল্লেখযোগ্য নদীসমূহ

আইলা নদী

আইলা নদী বরগুনা জেলার একটি ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ নদী। নদীটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১২ কিলোমিটার। স্থানীয় কৃষি ও মৎস্য কার্যক্রমে এই নদীর ভূমিকা রয়েছে। বর্ষা মৌসুমে নদীটি পানিতে পরিপূর্ণ থাকলেও শুষ্ক মৌসুমে এর নাব্যতা কমে যায়।

আন্ধারমানিক নদী

আন্ধারমানিক নদী বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপকূলীয় নদী, যা পটুয়াখালী ও বরগুনা জেলা অতিক্রম করেছে।

  • দৈর্ঘ্য: প্রায় ২৯ কিলোমিটার
  • গড় প্রস্থ: প্রায় ৫০০ মিটার
  • পাউবো পরিচিতি নম্বর: দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদী নং ৪

এটি গঙ্গা–পদ্মা নদীব্যবস্থার একটি বড় শাখা নদী এবং জোয়ার-ভাটার প্রবল প্রভাব রয়েছে। নদীটি মৎস্য সম্পদে সমৃদ্ধ এবং উপকূলীয় জীববৈচিত্র্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

আমুয়া নদী

আমুয়া নদী বরগুনা জেলার একটি মাঝারি আকারের নদী।

  • দৈর্ঘ্য: প্রায় ২০ কিলোমিটার

নদীটি স্থানীয়ভাবে নৌচলাচল, মাছ ধরা ও কৃষিকাজে ব্যবহৃত হয়। বর্ষাকালে নদীটি আশপাশের বিল ও খালগুলোকে পানিতে পূর্ণ রাখে।

গুলিশাখালী নদী

গুলিশাখালী নদী পটুয়াখালী ও বরগুনা জেলা জুড়ে বিস্তৃত।

  • দৈর্ঘ্য: প্রায় ২৩ কিলোমিটার
  • গড় প্রস্থ: প্রায় ১৪৫ মিটার
  • প্রকৃতি: সর্পিলাকার
  • পাউবো পরিচিতি নম্বর: দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদী নং ২৭

নদীটির তীরবর্তী এলাকায় কৃষি ও বসতি গড়ে উঠেছে। নদীভাঙন এখানে একটি মৌসুমি সমস্যা।

টিয়াখালী নদী

টিয়াখালী নদী বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ নদী, যা বরগুনা ও পটুয়াখালী জেলা অতিক্রম করে প্রবাহিত।

  • দৈর্ঘ্য: প্রায় ৩৮ কিলোমিটার
  • গড় প্রস্থ: প্রায় ১১০ মিটার
  • প্রকৃতি: সর্পিলাকার
  • পাউবো পরিচিতি নম্বর: দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদী নং ৩৭

এই নদীটি বরগুনার আমতলী ও তালতলী উপজেলার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নদীটির মাধ্যমে নৌ-যোগাযোগ, কৃষিপণ্য পরিবহন এবং মৎস্য আহরণ পরিচালিত হয়। বর্ষা মৌসুমে নদীটি প্লাবনভূমিকে পানিতে পূর্ণ করে, যা কৃষির জন্য সহায়ক হলেও অতিবৃষ্টিতে বন্যার ঝুঁকি তৈরি করে।

বলেশ্বর নদী

বলেশ্বর নদী বরগুনা জেলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নদীগুলোর একটি। এটি পিরোজপুর, বাগেরহাট ও বরগুনা জেলা অতিক্রম করে প্রবাহিত হয়েছে।

  • দৈর্ঘ্য: প্রায় ১৪৬ কিলোমিটার
  • গড় প্রস্থ: প্রায় ১৬৪৪ মিটার
  • প্রকৃতি: সর্পিলাকার
  • পাউবো পরিচিতি নম্বর: দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদী নং ৫৯

বলেশ্বর নদী সুন্দরবনের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় এটি পরিবেশগত দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নদীটি বঙ্গোপসাগরে গিয়ে মিশেছে এবং জোয়ার-ভাটার প্রবল প্রভাব বিদ্যমান। এই নদী বরগুনা জেলার মৎস্য সম্পদের প্রধান উৎসগুলোর একটি। তবে নদীভাঙন ও লবণাক্ততা এই নদী সংলগ্ন এলাকার একটি বড় সমস্যা।

বিষখালী নদী

বিষখালী নদী ঝালকাঠি ও বরগুনা জেলা জুড়ে বিস্তৃত একটি বড় নদী।

  • দৈর্ঘ্য: প্রায় ১০৫ কিলোমিটার
  • গড় প্রস্থ: প্রায় ৭৬০ মিটার
  • প্রকৃতি: সর্পিলাকার
  • পাউবো পরিচিতি নম্বর: দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদী নং ৬০

এই নদী বরগুনা জেলার অভ্যন্তরীণ নৌপথের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কৃষি, মাছ ধরা এবং নৌযান চলাচলে বিষখালী নদীর ভূমিকা অপরিসীম। বর্ষাকালে নদীর পানি বৃদ্ধি পেলেও শুষ্ক মৌসুমে নাব্যতা হ্রাস পায়।

বুড়িশ্বর (পায়রা) নদী

বুড়িশ্বর নদী পায়রা নদী নামেও পরিচিত। এটি বরিশাল, পটুয়াখালী ও বরগুনা জেলা অতিক্রম করে প্রবাহিত।

  • দৈর্ঘ্য: প্রায় ৯০ কিলোমিটার
  • গড় প্রস্থ: প্রায় ১২০০ মিটার
  • প্রকৃতি: সর্পিলাকার
  • পাউবো পরিচিতি নম্বর: দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদী নং ৫৭

এই নদীর মাধ্যমে বরগুনা জেলার সঙ্গে পটুয়াখালী ও বরিশাল অঞ্চলের নৌযোগাযোগ স্থাপিত হয়েছে। পায়রা সমুদ্রবন্দর গড়ে ওঠার ফলে নদীটির অর্থনৈতিক গুরুত্ব আরও বেড়েছে। এটি আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ।

হরিণঘাটা নদী

হরিণঘাটা নদী বাগেরহাট ও বরগুনা জেলা অতিক্রম করে প্রবাহিত একটি উপকূলীয় নদী। এটি গঙ্গা–পদ্মা নদীব্যবস্থার অন্যতম বড় শাখা নদী।
নদীটি মূলত সুন্দরবন সংলগ্ন অঞ্চলে প্রবাহিত হওয়ায় জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এখানে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ, কাঁকড়া ও জলজ প্রাণী পাওয়া যায়।

ছোট নদী, খাল ও দোনসমূহের ভূমিকা

বরগুনা জেলার নদীব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ছোট নদী, খাল ও দোন। প্রধান নদীগুলোর পাশাপাশি এসব জলপ্রবাহ বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত পানি ধারণ করে বন্যার চাপ কমায় এবং শুষ্ক মৌসুমে কৃষিকাজে পানির জোগান দেয়।

জেলায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা উল্লেখযোগ্য ছোট নদী ও খালের মধ্যে রয়েছে—
খাকদোন, টিয়াখালী দোন, বগীরখাল, বেহুলা নদী, চাকামাইয়া দোন, নিদ্রাখাল, আমতলী নদী, তালতলী খাল, কালির খাল, ধানসি খাল প্রভৃতি।
এই খালগুলো স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মাছ ধরা, সেচ, গবাদিপশু পালন এবং দৈনন্দিন পানির চাহিদা পূরণে সহায়ক।

অনেক খাল প্রাকৃতিকভাবে নদীর সঙ্গে যুক্ত থাকায় জোয়ার-ভাটার প্রভাব দেখা যায়। ফলে এসব খালে লবণাক্ততা প্রবেশ করে, যা একদিকে চিংড়ি চাষের সুযোগ তৈরি করলেও অন্যদিকে মিঠাপানির কৃষিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

নদীভাঙন ও পরিবেশগত সমস্যা

বরগুনা জেলার নদীগুলোর অন্যতম বড় সমস্যা হলো নদীভাঙন। বিশেষ করে বিষখালী, বলেশ্বর, পায়রা ও টিয়াখালী নদীর তীরবর্তী এলাকায় প্রতি বছর বহু পরিবার বসতভিটা ও আবাদি জমি হারাচ্ছে। নদীর সর্পিলাকার প্রকৃতি এবং প্রবল জোয়ার-ভাটার কারণে ভাঙনের মাত্রা বেড়ে যায়।

এছাড়াও উল্লেখযোগ্য পরিবেশগত সমস্যাগুলো হলো—

  • নদীর নাব্যতা হ্রাস
  • অবৈধ দখল ও ভরাট
  • শিল্প ও গৃহস্থালি বর্জ্য দ্বারা পানি দূষণ
  • অতিরিক্ত লবণাক্ততা বৃদ্ধি
  • জলজ জীববৈচিত্র্য হ্রাস

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস নদীগুলোর ওপর আরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সিডর, আইলা, বুলবুল ও আম্পানের মতো ঘূর্ণিঝড়গুলো বরগুনার নদীভাঙন ও লবণাক্ততা সমস্যাকে তীব্র করেছে।

বরগুনা জেলার নদীগুলোর অর্থনৈতিক গুরুত্ব

বরগুনা জেলার অর্থনীতিতে নদীগুলোর অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই নদীগুলো—

  • মৎস্য সম্পদের প্রধান উৎস
  • অভ্যন্তরীণ নৌ-যোগাযোগের মাধ্যম
  • কৃষি সেচ ব্যবস্থার ভিত্তি
  • চিংড়ি ও কাঁকড়া চাষের ক্ষেত্র
  • স্থানীয় বাজার ও বাণিজ্য কেন্দ্রের সংযোগস্থল

বিশেষ করে বলেশ্বর, বিষখালী ও পায়রা নদী জেলার প্রধান নৌপথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এসব নদী দিয়ে ধান, মাছ, লবণ, কাঠ ও অন্যান্য কৃষিপণ্য পরিবহন করা হয়।

বরগুনা জেলার নদ-নদী শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের উৎস নয়, বরং জেলার জীবন, জীবিকা ও অর্থনীতির চালিকাশক্তি। নদীগুলো যেমন উর্বরতা ও সম্পদ এনে দেয়, তেমনি নদীভাঙন ও পরিবেশগত ঝুঁকিও সৃষ্টি করে। সঠিক পরিকল্পনা, নদী সংরক্ষণ ও টেকসই ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই নদীগুলোকে বরগুনা জেলার উন্নয়নের প্রধান শক্তিতে পরিণত করা সম্ভব।

২ thoughts on “বরগুনা জেলার নদ-নদী”

Leave a Comment