বরগুনা জেলা বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের বরিশাল বিভাগের অন্তর্গত একটি উপকূলীয় জেলা। ১৯৮৪ সালে পটুয়াখালী জেলা থেকে বিভক্ত হয়ে গঠিত এই জেলার আয়তন ১,৮৩১ বর্গকিলোমিটার এবং জনসংখ্যা প্রায় ১০ লক্ষ। বঙ্গোপসাগরের তীরে অবস্থিত হওয়ায় এখানে সুন্দরবনের অংশ, সমুদ্র সৈকত, নদী-নালা, বনভূমি এবং ঐতিহাসিক স্থানের সমাহার রয়েছে। জেলাটি ৬টি উপজেলায় বিভক্ত: বরগুনা সদর, আমতলী, বামনা, বেতাগী, পাথরঘাটা এবং তালতলী। পর্যটনের দিক থেকে বরগুনা প্রকৃতি প্রেমীদের জন্য আদর্শ স্থান—যেখানে সমুদ্র সৈকত, বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য, ঐতিহাসিক মসজিদ এবং মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভ রয়েছে।

এই জেলার দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য: সোনাকাটা সমুদ্র সৈকত, লালদিয়া বন, ফাতরার বন ও ইকোপার্ক, রাখাইন পল্লী, বিবিচিনি শাহী মসজিদ, হরিন ঘাটা ইকোপার্ক, বিহঙ্গ দ্বীপ, বুকাবুনিয়া মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিস্তম্ভ, মোহনা পর্যটন কেন্দ্র (পালের বালিয়াতলী), মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র, শুভ সন্ধ্যা সমুদ্র সৈকত এবং সিডর স্মৃতিস্তম্ভ। এখানে প্রত্যেক স্থানের ইতিহাস, আকর্ষণ, কীভাবে যাবেন এবং সেরা সময় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো। বরগুনায় যাওয়ার সেরা সময় শীতকাল (নভেম্বর-ফেব্রুয়ারি), যখন আবহাওয়া মনোরম এবং ঝড়ের ঝুঁকি কম।
বরগুনা জেলার দর্শনীয় স্থান
টেংরাগিরি ইকোপার্ক (সোনাকাটা)
টেংরাগিরি ইকোপার্ক বরগুনা জেলার তালতলী উপজেলার সোনাকাটা ইউনিয়নে অবস্থিত, যা সুন্দরবনের একটি অংশ। ১৯৬০ সালে সংরক্ষিত বন হিসেবে ঘোষিত এই পার্কে বিশাল বনভূমি, বন্যপ্রাণী এবং সমুদ্র সৈকতের সমন্বয় রয়েছে। এখানে রয়েল বেঙ্গল টাইগার, হরিণ, বানর, বুনো শূকর এবং বিভিন্ন প্রজাতির পাখির দেখা মেলে। পার্কের পাশেই সোনাকাটা সমুদ্র সৈকত, যা সূর্যাস্তের দৃশ্যের জন্য বিখ্যাত। এটি প্রকৃতি প্রেমী এবং অ্যাডভেঞ্চার সিকারদের জন্য আদর্শ।
- ইতিহাস: সুন্দরবনের অংশ হিসেবে এটি বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের জন্য গড়ে তোলা হয়েছে। ২০১০-এর দশকে ইকোপার্ক হিসেবে উন্নয়ন করা হয়।
- কীভাবে যাবেন: বরগুনা সদর থেকে বাসে তালতলী যান (১ ঘণ্টা), তারপর অটোরিকশা বা মোটরসাইকেলে ২৪ কিমি দূরে সোনাকাটা। লঞ্চে ঢাকা থেকে সরাসরি কাকচিড়া ঘাটে নেমে যাওয়া যায়।
- সেরা সময়: শীতকাল, যখন বন্যপ্রাণী দেখার সুযোগ বেশি এবং আবহাওয়া অনুকূল।
- আকর্ষণ: ওয়াচটাওয়ার, বোটিং, ক্যাম্পিং এবং সৈকত ভ্রমণ।
লালদিয়া বন
লালদিয়া বন পাথরঘাটা উপজেলায় অবস্থিত একটি সংরক্ষিত বনভূমি, যা সুন্দরবনের সংলগ্ন। এটি ম্যানগ্রোভ ফরেস্টের জন্য বিখ্যাত, যেখানে সুন্দরী, গেওয়া, কেওড়া গাছের ঘন জঙ্গল রয়েছে। বন্যপ্রাণী যেমন হরিণ, বানর এবং বিভিন্ন পাখির বাসস্থান এটি। এখানে সমুদ্র সৈকতও রয়েছে, যা শান্তিপ্রিয় পর্যটকদের আকর্ষণ করে।
- ইতিহাস: ১৯৬০-এর দশকে সংরক্ষিত বন হিসেবে ঘোষিত, এটি দুর্যোগ প্রতিরোধে (যেমন ঘূর্ণিঝড়) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
- কীভাবে যাবেন: বরগুনা সদর থেকে বাসে পাথরঘাটা (১ ঘণ্টা), তারপর মোটরসাইকেলে লালদিয়া। পিরোজপুর থেকেও সড়কপথে যাওয়া যায়।
- সেরা সময়: শীতকাল এবং বর্ষার শুরু, যখন বন সবুজ এবং পাখির মাইগ্রেশন দেখা যায়।
- আকর্ষণ: বোট সাফারি, ট্রেকিং এবং ফটোগ্রাফি।

বিবিচিনি শাহী মসজিদ
বিবিচিনি শাহী মসজিদ বরগুনা জেলার বেতাগী উপজেলার বিবিচিনি গ্রামে অবস্থিত একটি প্রাচীন মসজিদ। এটি ১৭শ শতাব্দীর মুঘল যুগের স্থাপত্যের নিদর্শন, যা সুলতানি আমলের স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত। মসজিদটির নাম “বিবিচিনি” (চীনের মেয়ে) থেকে এসেছে, যা একটি ঐতিহাসিক কাহিনীর সঙ্গে যুক্ত। এটি বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন মসজিদ এবং পর্যটকদের জন্য ঐতিহাসিক আকর্ষণ।
- ইতিহাস: স্থানীয় কিংবদন্তি অনুসারে, চীনের এক রাজকন্যা এখানে বিয়ে করে আসেন এবং মসজিদটি নির্মাণ করেন। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের তত্ত্বাবধানে রক্ষিত।
- কীভাবে যাবেন: বরগুনা সদর থেকে বাসে বেতাগী উপজেলা (৩০ মিনিট), তারপর মোটরসাইকেল বা রিকশায় ১০ কিমি দূরে বিবিচিনি।
- সেরা সময়: যেকোনো সময়, তবে শুক্রবার নামাজের সময় এড়িয়ে চলুন।
- আকর্ষণ: প্রাচীন স্থাপত্য, শান্ত পরিবেশ এবং স্থানীয় কাহিনী।
হরিন ঘাটা ইকোপার্ক
হরিন ঘাটা ইকোপার্ক পাথরঘাটা উপজেলার দক্ষিণে অবস্থিত একটি প্রকৃতি-ভিত্তিক পর্যটন কেন্দ্র। এটি ম্যানগ্রোভ বন এবং সমুদ্র সৈকতের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে, যেখানে হরিণ, বানর এবং বিভিন্ন পাখির দেখা মেলে। পার্কটি বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ এবং পর্যটনের জন্য উন্নয়িত।
- ইতিহাস: ২০০০-এর দশকে ইকোপার্ক হিসেবে গড়ে তোলা হয়, সুন্দরবনের অংশ।
- কীভাবে যাবেন: বরগুনা সদর থেকে বাসে পাথরঘাটা, তারপর মোটরসাইকেলে হরিণঘাটা বাজার। বাসে বা নৌকায় যাওয়া যায়।
- সেরা সময়: শীতকাল, যখন বন্যপ্রাণী দেখার সুযোগ বেশি।
- আকর্ষণ: বোট সাফারি, ওয়াচটাওয়ার এবং সৈকত।
রাখাইন পল্লী
রাখাইন পল্লী তালতলী উপজেলায় অবস্থিত একটি রাখাইন জাতির গ্রাম। রাখাইনরা মিয়ানমার থেকে আগত বৌদ্ধ সম্প্রদায়, যাদের সংস্কৃতি, পোশাক এবং খাবার ঐতিহ্যবাহী। এখানে বৌদ্ধ মন্দির, ঐতিহ্যবাহী বাড়ি এবং হস্তশিল্প দেখা যায়।
- ইতিহাস: ১৮শ শতাব্দীতে রাখাইনরা এখানে বসতি স্থাপন করে। এটি বাংলাদেশের অন্যতম রাখাইন সম্প্রদায়ের বাসস্থান।
- কীভাবে যাবেন: আমতলী-তালতলী সড়ক ধরে সহজে যাওয়া যায়। বরগুনা সদর থেকে বাসে তালতলী, তারপর রিকশা।
- সেরা সময়: বৌদ্ধ উৎসবের সময় (যেমন বুদ্ধ পূর্ণিমা)।
- আকর্ষণ: রাখাইন পোশাক, খাবার (যেমন বাঁশের চিংড়ি) এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
বিহঙ্গ দ্বীপ
বিহঙ্গ দ্বীপ পাথরঘাটা উপজেলার একটি ছোট দ্বীপ, যা সমুদ্র সৈকত এবং পাখির অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত। এখানে শতাধিক প্রজাতির পাখির দেখা মেলে, বিশেষ করে শীতকালে। দ্বীপটি প্রকৃতি প্রেমীদের জন্য আদর্শ।
- ইতিহাস: সাম্প্রতিককালে পর্যটন স্থান হিসেবে উন্নয়িত।
- কীভাবে যাবেন: বরগুনা সদর থেকে লঞ্চে কাকচিড়া ঘাট, তারপর গাড়িতে পাথরঘাটা সদর এবং রূইতা গ্রাম। রূইতা বটতলা থেকে ট্রলার বা নৌকায় দ্বীপে যান।
- সেরা সময়: শীতকাল, পাখির মাইগ্রেশনের সময়।
- আকর্ষণ: পাখি পর্যবেক্ষণ, সৈকত এবং ক্যাম্পিং।
বুকাবুনিয়া মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিস্তম্ভ
বুকাবুনিয়া মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিস্তম্ভ বামনা উপজেলার বুকাবুনিয়া ইউনিয়নে অবস্থিত। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে এটি নবম সেক্টরের সাব-সেক্টর হেডকোয়ার্টার ছিল। মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতি রক্ষায় ২০১৩ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এটি উদ্বোধন করেন।
- ইতিহাস: মুক্তিযুদ্ধের সময় এখান থেকে যুদ্ধ পরিচালিত হয়। স্মৃতিস্তম্ভটি যুদ্ধের গৌরবময় ইতিহাস তুলে ধরে।
- কীভাবে যাবেন: বরগুনা সদর থেকে বাসে বামনা উপজেলা, তারপর রিকশায় বুকাবুনিয়া।
- সেরা সময়: ১৬ ডিসেম্বর (বিজয় দিবস) বা ২৬ মার্চ (স্বাধীনতা দিবস)।
- আকর্ষণ: ঐতিহাসিক স্মৃতিচিহ্ন, মুক্তিযোদ্ধাদের কাহিনী এবং শিক্ষামূলক প্রদর্শনী।
মোহনা পর্যটন কেন্দ্র, পালের বালিয়াতলী
মোহনা পর্যটন কেন্দ্র বরগুনা সদরের পালের বালিয়াতলীতে অবস্থিত, যা নদীমোহনার সৌন্দর্যের জন্য বিখ্যাত। এখানে নদী, সমুদ্র এবং বনের মিলন দেখা যায়।
- ইতিহাস: সাম্প্রতিককালে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে উন্নয়িত।
- কীভাবে যাবেন: বরগুনা সদর থেকে বাসে পরীরখাল, তারপর অটোরিকশায় পালের বালিয়াতলী। মোটরসাইকেলে ৪০ মিনিট।
- সেরা সময়: বর্ষাকাল, যখন মোহনা পূর্ণ।
- আকর্ষণ: বোটিং, ফিশিং এবং সূর্যাস্তের দৃশ্য।
মৎস্য অবতরণ এবং পাইকারী মৎস্য বিক্রয় কেন্দ্র
পাথরঘাটা উপজেলায় অবস্থিত এই কেন্দ্র বাংলাদেশের অন্যতম বড় মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র। এখানে প্রতিদিন হাজার হাজার টন মাছ আসে এবং পাইকারী বাজার হয়।
- ইতিহাস: সামুদ্রিক মৎস্য শিল্পের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছে।
- কীভাবে যাবেন: বরগুনা সদর থেকে বাসে পাথরঘাটা, তারপর স্থানীয় যানবাহনে কেন্দ্রে।
- সেরা সময়: সকাল, যখন মাছ আসে।
- আকর্ষণ: মাছের বাজার দেখা, সামুদ্রিক খাবার কেনা।
শুভ সন্ধ্যা সমুদ্র সৈকত
শুভ সন্ধ্যা সমুদ্র সৈকত তালতলী উপজেলার নিশানবাড়িয়া ইউনিয়নের নলবুনিয়ায় অবস্থিত। এটি একটি শান্ত সৈকত, যেখানে সূর্যাস্তের দৃশ্য অপূর্ব।
- ইতিহাস: সাম্প্রতিককালে পর্যটন স্থান হিসেবে পরিচিত।
- কীভাবে যাবেন: বরগুনা সদর থেকে বাসে তালতলী (১.৫ ঘণ্টা), তারপর অটোরিকশায় ১৫ কিমি দক্ষিণ-পশ্চিমে নলবুনিয়া।
- সেরা সময়: সন্ধ্যা, সূর্যাস্ত দেখার জন্য।
- আকর্ষণ: সৈকত ভ্রমণ, সামুদ্রিক খাবার এবং শান্ত পরিবেশ।
সিডর স্মৃতিস্তম্ভ
সিডর স্মৃতিস্তম্ভ বামনা উপজেলার গর্জনবুনিয়ায় অবস্থিত। ২০০৭ সালের ঘূর্ণিঝড় সিডরে নিহতদের স্মৃতিতে নির্মিত এটি ১৯টি কবরের চারপাশে গড়ে উঠেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৩ সালে উদ্বোধন করেন।
- ইতিহাস: সিডরে বরগুনায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়, যার স্মৃতি রক্ষায় নির্মিত।
- কীভাবে যাবেন: বরগুনা সদর থেকে বাসে বামনা, তারপর রিকশায় গর্জনবুনিয়া।
- সেরা সময়: যেকোনো সময়, তবে দুর্যোগ দিবসে বিশেষ অনুষ্ঠান হয়।
- আকর্ষণ: ঐতিহাসিক স্মৃতিচিহ্ন এবং শিক্ষামূলক প্রদর্শনী।
ফাতরার বন ও ইকোপার্ক
ফাতরার বন তালতলী উপজেলায় অবস্থিত একটি ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট, যা ইকোপার্ক হিসেবে উন্নয়িত। এখানে বন্যপ্রাণী এবং প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়।
- ইতিহাস: সুন্দরবনের অংশ, পর্যটনের জন্য সংরক্ষিত।
- কীভাবে যাবেন: বরগুনা থেকে বাসে তালতলী, তারপর স্থানীয় যানে ফাতরা।
- সেরা সময়: শীতকাল।
- আকর্ষণ: ট্রেকিং এবং বোটিং।
বরগুনা জেলা প্রকৃতি, ইতিহাস এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সমন্বয়। এখানকার দর্শনীয় স্থানগুলো পর্যটকদের জন্য অফ-বিট ডেস্টিনেশন। স্থানীয় খাবার যেমন সামুদ্রিক মাছ এবং কুয়াকাটার কাছাকাছি হওয়ায় আরও আকর্ষণীয়। পর্যটন বাড়াতে সরকারি উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ভ্রমণের আগে আবহাওয়া চেক করুন এবং পরিবেশ রক্ষা করুন।
১ thought on “বরগুনা জেলার দর্শনীয় স্থান”