বরগুনা জেলা কিসের জন্য বিখ্যাত

আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় বরগুনা জেলা কিসের জন্য বিখ্যাত? বরগুনা জেলা বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের বরিশাল বিভাগের একটি প্রশাসনিক অঞ্চল। ২০০৭ সালে ঘূর্ণিঝড় সিডর-এর আঘাতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত জেলা। বরগুনা দক্ষিণাঞ্চলের জেলা। এর উত্তরে ঝালকাঠি জেলা, বরিশাল জেলা, পিরোজপুর জেলা ও পটুয়াখালী জেলা, দক্ষিণে পটুয়াখালী জেলা ও বঙ্গোপসাগর, পূর্বে পটুয়াখালী জেলা, পশ্চিমে পিরোজপুর জেলা ও বাগেরহাট জেলা। বরগুনা জেলা ৬টি উপজেলা, ৬টি থানা, ৪টি পৌরসভা, ৪২টি ইউনিয়ন ও ২টি সংসদীয় আসন নিয়ে গঠিত।

 

বরগুনা জেলা কিসের জন্য বিখ্যাত

 

বরগুনা জেলা কিসের জন্য বিখ্যাত:-

নারিকেল:

বরগুনা জেলা নারিকেল এর জন্য বিখ্যাত। প্রচুর পরিমানে নারিকেল উৎপাদিত হয় বরগুনায়। সারা বাংলাদেশে এই নারিকেলের চাহিদা অনেক। স্বাদের জন্য ও এই নারিকেল বিখ্যাত। নারিকেল অতিরিক্ত ওজন কমাতে সহায়তা করে। নারিকেল খুব অল্প ক্যালোরিতেই মেটাবলিজম বৃদ্ধি করে অল্পক্ষণের মধ্যেই শরীরে শক্তি যোগায়। নারিকেল খেলে সহসা ক্ষুধাও লাগে না তাই ওজন কমে। হাড়ে ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়াম শোষণ করতে সাহায্য করে নারকেল এবং দাঁত ও হাড়ের গঠনে ভূমিকা রাখে।

 

বরগুনার নারিকেল

 

সুপারি:

উপকূলীয় জেলা বরগুনায় সবচেয়ে বেশি সুপারি উৎপাদন হয়। এখানকার সুপারি আকারে ছোট হলেও খেতে মিষ্টি হওয়ায় স্থানীয় চাহিদা পূরণ করে দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় চাহিদা মিটিয়ে থাকে। মৌসুমের শুরু থেকেই দেশের বিভিন্ন জেলার ব্যবসায়ীরা এসে সুপারি কিনে নেন।

 

বরগুনার সুপারি

 

চুইয়া পিঠা:

বরগুনা জেলার আঞ্চলিক খাবারের মধ্যে অন্যতম হলো চুইয়া পিঠা । অঞ্চলভেদে এই পিঠাকে চুষি পিঠা , চুই পিঠা বা হাতেকাটা সেমাই পিঠা বলা হয় । বরগুনা ছাড়াও বরিশাল বিভাগের প্রায় সব জেলায়ই কম বেশি এই পিঠা খাওয়ার প্রচলন রয়েছে ।
চুইয়া পিঠা বানানোর জন্য ব্যবহার করা হয় চালের গুড়ো , খেজুরের রস , খাটি গাইয়ের দুধ , গাছের পরিপক্ব নারকেল ও গ্রামের মহিলাদের হাতের বিশেষ কৌশল ।

শীতের রাতে গাছ থেকে খেজুরের রসের হাড়ি পেড়ে সারারাত বসে গ্রামের মহিলারা চুইয়া পিঠা কাটেন হাত দিয়ে । সেই পিঠা রান্না করে রেখে দেয়া হয় বড় হাড়িতে । সকাল সকাল বাড়ির উঠোনে রোদে বসে পরিবার , প্রতিবেশী ও আত্নীয় স্বজনদের সাথে জমে যাওয়া ঠান্ডা পিঠা খাওয়ার মজাই আলাদা । চুইয়া পিঠা বরগুনা জেলার সাধারণ মানুষের খুবই প্রিয় একটি শীতকালীন পিঠা ।

 

বরগুনার চুইয়া পিঠা

 

চ্যাবা পিঠা:

চুইয়া পিঠার মতো একই ধাচের আরেকটা পিঠা হলো চ্যাবা পিঠা । চুইয়া পিঠার আকৃতি হয় চিকন ও ছোট ছোট , কিছুটা সেমাই এর ধাচের আর চ্যাবা পিঠা হয় ছোট , লম্বাকৃতির ও চ্যাপ্টা । চ্যাপ্টা চ্যাপ্টা করে তৈরি করা হয় বলেই মূলত এর নাম চ্যাবা পিঠা ।

চুইয় পিঠার মতোই চ্যাবা পিঠা বানানো হয় চালের গুড়ো , খেজুরের রস (না থাকলে খেজুর গুড়) , নারকেল ও দুধ দিয়ে । চ্যাবা পিঠা ঠান্ডা হয়ে জমে গেলে খেতে বেশি মজা হয়।

 

চ্যাবা পিঠা

 

মুইট্টা পিঠা:

বরগুনা জেলার একদমই প্রাচীন ঐতিহ্যের ধারক মুইট্টা পিঠা । গ্রাম বাংলার মানুষের ঘরে ঘরে খুবই প্রচলিত একটি খাবার এই ‘মুইট্টা পিঠা’। হাতের মুঠোয় করে চেপে চেপে মুঠির আকৃতিতে বানানো হয় বলেই এর নাম হয়েছে মুইট্টা পিঠা।

মুইট্টা পিঠা বানানো হয় ভাপে সিদ্ধ করে । চালের গুড়ো , নারকেল , গুড় একত্রে মিশিশে হালকা পানি দিয়ে একটু ভেজা ভেজা করে নেয়া হয়, যাতে হাতে নিয়ে একটু চাপ দিলেই দলা পাকিয়ে যায় । হাতের মুঠোয় নিয়ে চাপ দিলে যে দলা হয় সেটাকে ভাপে সিদ্ধ করলে পুরোপুরি শক্ত হয়ে চালের গুঁড়োর দানা গুলো একদম সেট হয়ে যায় । পিঠার উপরে হাতের আঙুলের ছাপগুলো বসে যায় , ঠিক যেন একমুঠো আটার গোলা। কামরে কামরে নারকেলের স্বাদ , সাথে খেজুর গুড়ের মন মাতানো সুঘ্রাণ । শীতের সকালে গরম গরম মুঠি পিঠা খাওয়ার মজাই আলাদা ।\

 

বরগুনার মুইট্টা পিঠা

 

রুটি পিঠা:

বরগুনার মানুষের খুবই জনপ্রিয় একটি খাবার রুটি পিঠা । চালের রুটিকেই মূলত এই অঞ্চলের মানুষ রুটি পিঠা বলে । কোনো উৎসব অনুষ্ঠান , কোরবানির ঈদ, শীতের রাতে বা বাড়িতে মেহমান আসলে – চালের রুটি হয় সবথেকে স্পেশাল আইটেম । সারা রাত চাল বেটে রুটি বানিয়ে পুরো বাড়ির লোকজন রাত জেগে পিঠা খায়।

পিঠা বানানোর জন্য চলে আশে পাশের বাড়ির মহিলারাও। সে এক উৎসব মূখর পরিবেশ । সারা রাত ধরে চুলা জ্বলতে থাকে , একটা একটা রুটি ভেজে উঠাতে উঠাতেই খেয়ে সাবার । এভাবেই সবাই মিলে শীতের রাতে উৎসব মূখর পরিবেশে রুটি পিঠা খাওয়া অনেক বেশি আনন্দের ।

রুটি পিঠার সাথে থাকে দেশী মুরগির ঝোল , চিংড়ি মাছের সুরুয়া , আল্লান , হাঁসের মাংস অথবা গরুর মাংস ।

 

বরগুনার হাঁসের মাংস ও রুটি পিঠা

 

তালের মোরব্বা:

নাম তালের মোরব্বা হলেও খাবারটি কিন্তু তাল দিয়ে তৈরি করা হয় না।
একটা ধাধা আছে বরগুনার ভাষায়- ” কাঁচা খায়, পাকা কায়,হালাইয়া দিয়া আবার খায়” এর উত্তর হলো ‘তাল’। সেই ফেলে দেয়া জিনিস থেকেই তৈরি হয় তালের মোরব্বা। কি একটু আবাক হলেন তো?

পাকা তাল থেকে তালের রস টা আলাদা করে বিচি গুলো নরম মাটির উপর বা পুরোনো অব্যবহৃত মাটির চুলার মধ্যে রেখে দেয়া হয়। মাস কয়েক পরে তালের বিচির মাথায় গজ বা শিকড় বের হয়। সেই গজ বের হওয়া তালের বিচি কাটলে ভেতর থেকে ফোমোর মতো মিষ্টি ও কিছুটা রসালো একধরনের বস্তু পাওয়া যায়। বরগুনার ভাষায় একে বলে তালের ফোঁপরা। এই ফোঁপরা শুধু খেতেও খুব মজা।

এই ফোপরা দুধ চিনি দিয়ে রান্না করে তৈরি করা হয় তালের মোরব্বা।তালের মোরব্বা বরগুনা জেলার একদমই অথেনটিক একটি খাবার।

 

বরগুনার তালের মোরব্বা

 

শিরনি

শরনি হলো বরগুনা জেলার একটি ট্রেডিশনাল ডেজার্ট আইটেম । বরগুনা বা বরিশাল বিভাগের আঞ্চলিক ভাষায় একে বলা হয় ‘শিন্নি’। এই অঞ্চলে প্রাকৃতিক ভাবেই অনেক দেশীয় খেজুর গাছ জন্মায় । শীতের সময় গাছে হাড়ি ঝুলিয়ে রস সংগ্রহ করা হয়। গাছ থেকে রসের হাড়ি নামিয়ে ক্ষেতের ধানের আল্লা চাউল ও গাছের নারকেল কোড়া দিয়ে এক হাঁড়িতে জ্বাল করে রান্না করা হয় শিরনি বা শিন্নি।

শীতের রাতে উঠোনের মাঝখানে বড় চুলোয় শিরনি বসিয়ে বাড়ির ছেলেমেয়েরা একত্রিত হয়ে চুলোর চারপাশে বসে আগুন পোহায়। রান্না হয়ে গেলে কলাপাতায় নিয়ে শিরনি খাওয়ার প্রচলন সেই প্রাচীনকাল থেকেই ।

শিরনি নিয়ে মজার ঘটনাও আছে গ্রাম বাংলার ছেলেপেলে দের। রাতের বেলায় কয়েকজন বন্ধু বান্ধব মিলে অন্যের গাছের রসের হাড়ি পেড়ে সেই রাতের অন্ধকারে শিরনি রান্না করে মোটামুটি একটা পিকনিক আয়োজন করে। এভাবে শিরনি খাওয়ার প্রচলন বেশ জনপ্রিয় গ্রামে গঞ্জে।

 

নাড়িকেলের সুরুয়া

একদমই আনকমন স্বাদের বরগুনা জেলার বেশ জনপ্রিয় খাবার নাড়িকেলের সুরুয়া। আগেই বলা হয়েছে এই অঞ্চলের মানুষের কাছে রুটি পিঠা খুব পছন্দের খাবার। আর রুটি পিঠার সাথে দারুন কম্বিনেশন হয় নাড়িকেলের সুরুয়ার । গরম গরম ফুলকো ফুলকো চালের রুটি নারিকেলের সুরুয়ায় ভিজিয়ে খাওয়া, সে যেন এক অমৃত স্বাদ।

বরগুনা জেলায় নারিকেল খুব ভালো জন্মায় , তার সাথে আছে খাল থেকে ধরা কুচো চিংড়ি । নারকেল বাটা ও কুচো চিংড়ি অথবা একটু বড় সাইজের চিংড়ি মাছ দিয়ে সব ধরনের মসলা দিয়ে রান্না করা হয় নারকেলের ঝোল। ঝোলের থিকনেস টা হয় অনেকটা পাতলা ডালের মতো । খেতে এতোটাই সুস্বাদু , একবার খেলে যে কারো মনে থাকবে আজীবন ।

বাংলাদেশের ঐতিহ্য মানেই এর বিশাল একটা অংশ জুড়ে থাকবে বাঙালির খাওয়া দাওয়া। হ্যাঁ, এটাই বাঙালির গৌরব , বাঙালির ঐতিহ্য। ভোজন রসিক বাঙালির পরিচয় অনেকটাই পাওয়া যায় তাদের খাদ্যাভ্যাসের মাধ্যমে।

 

তালের নারিকেলের সুরুয়া

 

বিসকি

বিসকি একমাত্র বরিশালের আশেপাশের জেলার মানুষই খেয়ে থাকে। এর বাইরে এই খাবারটির সাথে খুব কম মানুষই পরিচিত । চাল ভেজে সেটাকে সারা রাত ভিজিয়ে রেখে পরেরদিন সকালে সেই ফুলে ওঠা ভেজা চালভাজাকে নারকেল ও গুড় দিয়ে পাক দেয়া হয়।এই খাবারটি অনেকের কাছে মিঠা ভাত নামেও পরিচিত ।কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, দিন দিন এই বিসকি খাওয়ার প্রচলন বরিশালের স্থানীয় লোকজনদের মধ্যে থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে ।

 

বরগুনা জেলার খাবার বিসকি

 

চালের রুটি:

বরগুনার মানুষের খুবই জনপ্রিয় একটি খাবার রুটি পিঠা । চালের রুটিকেই মূলত এই অঞ্চলের মানুষ রুটি পিঠা বলে । কোনো উৎসব অনুষ্ঠান , কোরবানির ঈদ, শীতের রাতে বা বাড়িতে মেহমান আসলে – চালের রুটি হয় সবথেকে স্পেশাল আইটেম । সারা রাত চাল বেটে রুটি বানিয়ে পুরো বাড়ির লোকজন রাত জেগে পিঠা খায়।

 

গুগল নিউজ
আমাদের গুগল নিউজে ফলো করুন

 

বরগুনা জেলার বিখ্যাত স্থান:

পাথরঘাটা হরিণঘাটা লালদিয়া সমুদ্র সৈকত:

লালদিয়া সমুদ্র সৈকত বাংলাদেশের বরগুনা জেলার পাথরঘাটা উপজেলায় অবস্থিত বলেশ্বর নদী ও বিষখালী নদীর মোহনায় এবং লালদিয়া বনের পাশে অবস্থিত। কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের আদলে গড়ে তোলা হচ্ছে এ সৈকত। বরগুনা হতে বাসযোগে পাথরঘাটা যাওয়ার পর মোটর সাইকেলে অতি সহজে লালদিয়া বনে যাওয়া যাবে। এছাড়াও পিরোজপুর হয়ে পাথরঘাটায় যাওয়া যায়।[১] হরিণঘাটা থেকে লালদিয়া বন ধরে হেটে গেলে সৈকতে পৌঁছাতে সময় লাগে ঘণ্টা দুয়েক।

এখান থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত অবলোকন করা যায়। এক পাশে সমুদ্র অন্য পাশে বন, মাঝে সৈকত, এমন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য প্রকৃতিতে বিরল। লালদিয়া সমুদ্রসৈকত পাড়ে গড়ে তোলা হয়েছে ঝাউবন। হরিণবাড়িয়া বনে নির্মিত ৯৫০ মিটার দীর্ঘ ফুটট্রেল (পায়ে হাঁটার কাঠের ব্রিজ) সম্প্রসারিত করে লালদিয়া সমুদ্রসৈকত পর্যন্ত নেয়া হয়েছে।

 

পাথরঘাটা হরিণঘাটা লালদিয়া সমুদ্র সৈকত

 

সোনাকাটা সমুদ্র সৈকত ও সোনাকাটা ইকোপার্ক:

সোনাকাটা সমুদ্র সৈকত ও সোনাকাটা ইকোপার্ক একই স্থানেই অবস্থিত। এখান থেকে ইকোপার্কের অনাবিল সৌন্দর্যসহ সমুদ্র সৈকতের সূর্য অস্ত সুন্দর ভাবে দেখা যায়।

সোনাকাটা সমুদ্র সৈকত ও সোনাকাটা ইকোপার্ক 4

 

 

ফাতরার বন:

আন্ধারমানিক নদীর মোহনার পশ্চিম দিকে রয়েছে সুন্দরবনের শ্বাসমূলীয় বনাঞ্চল, নাম তার ফাতরার বন যা বইয়ের ভাষায় টেংরাগিরি বনাঞ্চল নামেও পরিচিত। ভৌগোলিকভাবে বরগুনা জেলায় বাগানটির অবস্থান থাকলেও কুয়াকাটায় আগত পর্যটকরা বিনোদনের জন্য সেখানে ট্রলার যোগে যাতায়াত করেন। তবে সুন্দরবনের অংশ হলেও এ বনে নেই তেমন কোন হিংস্র প্রাণী। দিনে দুইবার এটি জোয়ার- ভাটায় প্লাবিত হয়।

জোয়ার- ভাটার উপস্থিতির কারণে, বনে সুন্দরি, কেওড়া, বাইন, গোলপাতা সহ দেখা মিলবে আরো বিভিন্ন প্রজাতির বৃক্ষের। ভাগ্য সহায় হলে দেখা মিলবে অজগর, গোখরা গুই সাপের মতো সরীসৃপের। এছাড়া ছোট বড় বিভিন্ন প্রজাতির পাখির ডাকে বিমোহিত হওয়ার সুযোগতো রয়েছেই। বন মোরগ, বানর আছে এ বনে। কদাচিৎ এ বনে বুনো শুকরেরও দেখা মেলে। কুয়াকাটা থেকে ফাতরার বনে যেতে হবে ইঞ্জিন নৌকাযোগে।

 

বিসকি

 

বেতাগী বিবি চিনি মসজিদ (মোঘল আমলে স্থাপিত):

বিবি চিনি মসজিদ বরিশাল বিভাগের বরগুনা জেলার বেতাগী উপজেলার বিবি চিনি গ্রামে অবস্থিত। এটি বাংলাদেশের ঐতিহাসিক মসজিদগুলোর মধ্যে অন্যতম মসজিদ।

বরগুনার বেতাগী উপজেলার বিবিচিনিতে এই মসজিদটি অবস্থিত। বরগুনা বেতাগী উপজেলা সদর থেকে আঞ্চলিক মহাসড়ক ধরে উত্তর দিকে ১০ কিলোমিটার পথ অগ্রসর হলেই বিবিচিনি গ্রাম। দিগন্তজোড়া সবুজের বর্ণিল আতিথেয়তায় উদ্ভাসিত ভিন্ন এক ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যে উঁচু টিলার উপর মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে মোঘল স্থাপত্যকর্মের এই ঐতিহাসিক মসজিদ।

সম্রাট শাহজাহানের সময় সুদূর পারস্য থেকে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে শাহ নেয়ামতউলল্লাহ দিল্লিতে আসেন। এ সময় দিল্লির সম্রাট শাহজাহানের দ্বিতীয় পুত্র বঙ্গদেশের সুবাদার শাহ সুজা তার শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন এবং কতিপয় শিষ্যসহ বজরায় চড়ে তিনি ইসলাম প্রচার ও ইবাদতের জন্য ভাটির মুল্লুকে প্রবেশ করেন।

শাহ নেয়ামতউল্লাহ বজরায় চড়ে দিল্লি থেকে রওনা হয়ে গঙ্গা নদী অতিক্রম করে বিষখালী নদীতে এসে পৌঁছলে বিবিচিনিতে শাহজাদা বাংলার সুবেদার মোহাম্মদ শাহ সুজার অনুরোধে একই গ্রামে এক গম্বুজবিশিষ্ট এই মসজিদটি প্রতিষ্ঠা করেন। বিবিচিনি গ্রামের পার্শ্ববর্তী গ্রাম নেয়ামতি। নেয়ামতিও নেয়ামত শাহের নামানুসারে নামকরণ করা হয় বলে জানা যায়।

বিবিচিনি শাহী মসজিদ আমাদের দেশের অন্যতম ঐতিহাসিক স্থান। ১৬৫৯ সালে হযরত শাহ নিয়ামত উল্লাহ পারস্য থেকে এই অঞ্চলে আসেন ইসলাম প্রচার করতে। এই মসজিদটি এবং এখানকার গ্রামটি তারই কন্যা “হায়াচ বিবি চিনির” নামে নামকরণ করা হয়েছে। স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা যায় এই তিনটি কবর হল হযরত শাহ নিয়ামত উল্লাহ ও তার দুই কন্যা চিনিবিবি এবং ইশা বিবির। ১৭০০ সালে হযরত শাহ নিয়ামত উল্লাহ এর মৃত্যুর পর তাকে মসজিদের পাশে সমাহিত করা হয়। ‘বিবি চিনি’ মসজিদও মুঘল আমলে প্রতিষ্ঠিত।

প্রাচীন এই মসজিদের দেয়ালে তিনটি প্রবেশ পথ রয়েছে। এবং মসজিদটি খিলানের সাহায্যে বানানো হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। মসজিদটি ৩৩ ফুট লম্বা, ৩৩ ফুট চওড়া এবং মসজিদটির দেয়াল প্রায় ৬ ফুট প্রশস্ত। এছাড়া মসজিদের পাশে ৪০ ফুট থেকে ৪৫ ফুট লম্বা তিনটি কবর রয়েছে যেগুলো আজ বিলীন হবার পথে। মসজিদে ব্যবহৃত মোঘল আমলের ইট দেখে ধারণা করা হয় মসজিদটি মোঘল আমলে নির্মিত হয়েছিল।[৩] মসজিদের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ থেকে সংস্কার করা হয় (১৯৯৩)।

১৯৮৫ সালে বেতাগী উপজেলার প্রশাসন মসজিদটি প্রথম সংস্কার করা করে। ১৯৯২ সালে, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ মসজিদটির রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারের দায়িত্ব গ্রহণ করে এবং এটিকে প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান হিসাবে তালিকাভুক্ত করে।

 

শুভ সন্ধ্যা সমুদ্র সৈকত

 

তালতলীর বৌদ্ধ মন্দির ও বৌদ্ধ একাডেমী:

আমতলী উপজেলার তালতলী রাখাইন প্রধান এলাকা। এখানে একাধিক রাখাইন বৌদ্ধ মন্দির রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম প্রধান একটি মন্দির ছিল তাঁতীপাড়ায়। স্থানীয়ভাবে জানা যায়, সাধীনতার পর তাঁতীপাড়ার রাখাইন সমপ্রদায়ের লোকজন হ্রাস পেতে থাকলে পার্শ্ববর্তী কলাপাড়া উপজেলার জনৈক থঞ্চানন মাষ্টার সেই তাঁতীপাড়ার মন্দির থেকে অষ্টধাতুর তৈরী আশি মণ ওজনের বুদ্ধ মূর্তিটি চট্টগ্রাম হয়ে বার্মায় নিয়ে যাওয়ার জন্যে সামপানে তুলে রওয়ানা দেয়। তখন বড়বগী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান অংকুজান তালুকদার, চানজোয়া তালুকদার, মংখেলা, আমজাদ মৃধা প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ স্থানীয় লোকজন নিয়ে মূর্তিসহ নৌকাটি আটক করেন।

এ সময় রাখাইন নেতৃবৃন্দ মূর্তিটি পার্শ্ববর্তী তালতলী জয়ারামা বৌদ্ধ মন্দিরে (তালতলী বৌদ্ধ বিহার) প্রতিস্থাপন করার সিদ্ধান্ত নেন। সেই থেকে মূর্তিটি তালতলী মন্দিরে রয়েছে। ধর্মপ্রাণ রাখাইন সমপ্রদায়ের লোকজন পরম শ্রদ্ধায় অষ্টধাতু নির্মিত এ মূর্তিতে তাদের পূজা দিয়ে থাকেন। জানা যায়, মূর্তিটি ১৯১৬ সালে নলবুনিয়া আগাপাড়াতে তৈরী হয়। আশিমণ ওজনের এ মূর্তির সমপূর্ণ অংশ খাঁটি সোনার প্রলেপে ঢাকা। তালতলীতে আগত পর্যটকদের জন্য এই বুদ্ধ মূর্তি অন্যতম প্রধান আকর্ষণ।

 

তালতলীর বৌদ্ধ মূর্তি

 

বিহঙ্গ দ্বীপ বা ধানসিড় চর:

বিহঙ্গ দ্বীপ বরগুনা জেলার পাথরঘাটা উপজেলার বঙ্গোপসাগরে বলেশ্বর নদীর একটি দ্বীপ। দ্বীপটি বহু আগে জেগে উঠলেও সম্প্রতি এর নামকরণ করা হয় বিহঙ্গ দ্বীপ। স্থানীয়দের কাছে এটি ধানসির চর নামে পরিচিত। একসময় এ দ্বীপে প্রচুর ধানসি জন্মাত। এটি বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন থেকে অতি নিকটে অবস্থিত। পশ্চিমে বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন, পূর্বে পাথরঘাটা উপজেলা, উত্তরে একাংশে পাথরঘাটার চরদুয়ানী ইউনিয়ন অপরাংশে সুন্দরবন এবং দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের মধ্যবর্তী বলেশ্বর নদের উপর বিহঙ্গ দ্বীপ।

 

বিহঙ্গ দ্বীপ বা ধানসির চর

 

শুভ সন্ধ্যা সমুদ্র সৈকত,নলবুনিয়া,তালতলী:

শুভ সন্ধ্যা সমুদ্র সৈকত সমুদ্রের কোল ঘেঁষা প্রান্তিক জেলা বরগুনার তালতলী উপজেলার নিশানবাড়িয়া ইউনিয়নের নলবুনিয়ায় অবস্থিত এই সৈকত। সাগর তীরের বালুকণা পর্যটকদের দু-পায়ের অলঙ্কার হয়ে সঙ্গে থাকে। সীমাহীন সাগর তীরের মুক্ত বাতাস আর চোখ জুড়ানো প্রাকৃতিক শোভা যেন এই সৈকতটির দৃষ্টি আকর্ষণের টোপ।

আলোচ্য সৈকতটিকে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে রূপ দিতে নিরন্তর চেষ্টা শুরু করেছিলেন তৎকালীন তালতলীর উপজেলা নির্বাহী অফিসার বদরুদ্দোজা শুভ ও জনাকয়েক স্থানীয় পর্যটকপ্রেমী গণমাধ্যমকর্মী। তারই ধারাবাহিকতায় গত বছর (১ ডিসেম্বর ২০১৭) পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে জায়গাটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন সদ্য বদলিকৃত উপজেলা নির্বাহী অফিসার বদরুদ্দোজা শুভ। তার নামের সঙ্গে মিল রেখেই এই পর্যটন কেন্দ্রটির নামকরণ করা হয় ‘শুভ সন্ধ্যা সমুদ্র সৈকত পর্যটন কেন্দ্র।

তালতলী উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে শুভ সন্ধ্যা সমুদ্র সৈকত অবস্থিত। বরগুনা জেলার প্রধান তিনটি নদী পায়রা, বিষখালী ও বলেশ্বরের মিলিত জলমোহনায় সৈকতটি দাঁড়িয়ে আছে যৌবনা রূপ নিয়ে। বেলাভূমিটি প্রায় চার কিলোমিটার লম্বা এলাকাজুড়ে বিস্তৃত।

প্রকৃতি ও গঠনগত দিক থেকে এটি অন্যান্য সমুদ্র সৈকত থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এর একদিকে দিগন্ত জোড়া জলরাশি, অন্যদিকে ঝাউ বন দেখা যায়। দুপাশে সারি সারি ঝাউ গাছের ভেতর ঢুকলেই মনে হবে যেন এক স্বপ্নরাজ্যে ঢুকে পড়েছেন আপনি। নির্জন রাস্তা ধরে পায়ে হেঁটে আপনাকে পৌঁছাতে হবে শুভ সন্ধ্যা সমুদ্র সৈকতে। কিছুক্ষণের মধ্যে দেখা মিলবে বিস্তীর্ণ সমুদ্র পাড়ের, আর বালুর বুকে নানা আলপনায় অলংকৃত করে রেখেছে কাঁকড়ারা।

একদিকে সমুদ্রের জলরাশি অন্যদিকে ঝাউবন এখানে আসা স্বল্প সংখ্যক পর্যটকদেরও দিচ্ছে বাঁধ ভাঙা আনন্দ। কেউবা সমুদ্রের পানিতে পা ভিজিয়ে ছুটে বেড়াচ্ছেন, আবার কেউ সঙ্গীকে নিয়ে বালুর বুকে দাঁড়িয়ে ছবির ফ্রেমে বন্দি হচ্ছেন। হেঁটে চলেছেন সমুদ্র পাড়ের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে।সূর্য যখন হেলে পড়বে পশ্চিম আকাশে, সমুদ্রের পানি আর পাড়ের বালি তখন স্বর্ণালী আলোয় ঝিলমিল করবে। আর এখান থেকেই উপভোগ করতে পারবেন সমুদ্রের বুকে লাল কুসুম সূর্য অস্ত যাওয়া।

সৈকতটি এখনো সরকারী ভাবে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেনি। তবে বর্তমানে প্রচন্ড মানুষের সমাগম হয়। যা স্থানীয় মানুষদের অর্থনীতিতে অবদান রাখছে। আগে সৈকতে বোট ভাড়া/গাড়ি পার্কিং এর কোন সু-ব্যবস্থা ছিল না। সাম্প্রতিক কালে কর্তৃপক্ষ তা বেঁধে দিয়েছেন। তবে ট্যুরিস্ট পুলিশ না থাকায় রাতে সৈকতটি নিরাপদ নয়।

 

বরগুনা জেলা কিসের জন্য বিখ্যাত

 

২ thoughts on “বরগুনা জেলা কিসের জন্য বিখ্যাত”

Leave a Comment